Monday, 3 October 2016

উদয়পুরে দু রাত

উদয়পুরে দু রাত্তির

৩০.০৯.২০১৬ - ০২.১০.২০১৬

উদয়পুর এখন স্বনামে খ্যাত, বিশেষ করে বাংলা আর ঊড়িষ্যার ট্যুরিজম ডিপার্ট্মেন্টের রেশারেশির ফলে এখন খবরের কাগজে মাঝে মাঝেই জায়গা করে নিচ্ছে।

পরপর দিনদিন ছুটি, অনঘের উড়ুউড়ু মন। কাকদ্বীপ দীঘা সব ঘুরে শেষে ঠিক হল উদয়পুরেই যাওয়া হবে। একে নিরিবিলি তার ওপর ওসিয়ানায় থাকার ইচ্ছেটাও ছিল।

উঠল বাই ত কটক যাই। ওসিয়ানায় ঘর এবং ট্রেনের টিকিট বুক করা হল। বেচারা সৈকত ছুটি ম্যানেজ  না করতে পারায় সঙ্গী হল চিরাগ। ওর একটা বিশেষ ক্ষমতা হল, খুব তাড়াতাড়ি মিশে যেতে পারে। যদিও সৈকতের হঠাৎ করে ঘুম ভেঙ্গে করা দমফাটা হাসির মন্তব্যগুলো খুব মিস করেছি। 




যাওয়া-আসা ট্রেনে। সকাল ৬.৪০ এ তাম্রলিপ্ত। 2S ১০০ টাকা ভাড়া। এসি পাইনি, তাই ফেয়ার জানিনা। প্যান্ট্রী কার আছে। ব্রেকফাস্ট মোটামুটি। আমরা আগেই Food-on-Track এ অর্ডার দিয়েছিলাম। ট্রেনে উঠতেই গরম গরম খাবার দিয়ে গেল। ব্রেকফাস্ট ৬০/-। ব্রেড,বাটার,জ্যাম আর দুটো ডিম।





থেকেছি ওসিয়ানা, ওয়েস্ট বেঙ্গল ফিসারীজ ডিপার্ট্মেন্টের। ভারী সুন্দর ব্যবস্থা। ১২০০ টাকায় এসি ঘর। আট্যাচড বাথ (কমোড এবং গীজারসহ)। তিনজনের উপযুক্ত বড় খাট। তৃতীয়জনের জন্য ১০০ টাকা বেশী লাগবে।





খাওয়া ওসিয়ানাতেই। রান্না খুব সুন্দর, দামও নাগালের মধ্যে। তবে কেউ যদি ভাবেন ফিসারীজ ডিপার্ট্মেন্টের বলে নানারকম মাছ পাবেন, আশাহত হবেন। 




ভাত, লেবু, পেঁয়াজ, কাঁচালঙ্কা, একটা ভাজা, ঘন ডাল, সব্জী, মাছ/মাংস/ডিম, চাটনী সঙ্গে পাপড়।


.
সমুদ্রের ছবি তুলব কি, মেঘ দেখেই অস্থির। অপূর্ব্ব সুন্দর - সমুদ্রের সাথে মেঘের মেল-বন্ধন।

বীচে যাওয়ার সিড়ি।





নীচে কাশফুলের মেলা,
ওপরে মেঘের খেলা।



নৌকা পুজা। মাছ ধরতে যাওয়ার আগে। 





জীবন মরণের পড়োয়া না করে,
বন্ধু দেখ  জলে রয়েছি দাড়ায়ে।



কাঁকড়া ভাজার অপেক্ষায়।
ঘন্টাখানেক ধরেই বলে যাচ্ছেন পাঁচ মিনিটের মধ্যে দিচ্ছি।

জলযান ডাঙ্গায় অসহায়।


দিগভ্রান্ত পথিক। 

চিংড়ির প্রতিপালন কেন্দ্র

পরম্পরা, বিশ্ব বাংলা, দীঘা






এই সেই রাস্তা, যা নিয়ে বাংলা উড়িষ্যার বিরোধ চরমে।
বাঁদিকে বাংলা, ডানদিকে উড়িষ্যা।

একফালি মেঘ। 


Monday, 18 July 2016

বেথুয়াডহরী অভয়ারণ্য - কৃষ্ণনগর (১০-১১.৭.২০১৬)

বেথুয়াডহরী অভয়ারণ্য - কৃষ্ণনগর

 (১০-১১.৭.২০১৬)

এক ঘন বর্ষায়

বাড়ি থেকে বেড়ুলামঃ ১০.৭.২০১৬

হাজারদুয়ারী এক্সপ্রেস, কোলকাতা স্টেশন, সকাল ৬.৫০ ঃঃ বেথুয়া স্টেশন, সকাল ৯.৩৫
ভাড়াঃ এসি চেয়ার কারঃ ২৬০/-, সেকেন্ড সিটিংঃ ৭০/-

স্টেশন থেকে অভয়ারণ্যঃ টোটো, ভাড়া প্রতি জন ১০ টাকা, ৪ কিমি।

রাত্রিবাসঃ ফরেস্ট রেস্ট হাউস, ভাড়া ৫০০/- দুজনের ঘর প্রতি দিন। দুটো মাত্র ঘর। বাদিকের ঘরে পশ্চিমা বাথ্রুম (কমোড আছে), ডানদিকেরটা ভারতীয়। ঘর এবং বাথ্রুম বেশ বড় এবং পরিস্কার। মাঝে ডাইনিং হলে ডাইনিং টেবল সহ খাবার ব্যবস্থা। জল বাইরে থেকে কিনে আনা বাঞ্ছনীয়। ডাইনিং হলে টিভি (চলে না) এবং রেফ্রিজারেটর (চলে) আছে। সান্ধ্য বৈঠকের জন্য একেবারে ঠিকঠাক। 

খাওয়া দাওয়াঃ বাইরে ছোটখাটো কিছু দোকান আছে বটে, তবে তা দুপুরের বা রাতে খাবার জন্য একেবারেই উপযুক্ত নয়। চিন্তার কিছু নেই, শঙ্কর কীর্ত্তনীয়া ( ৯৮৫১৭২৭৭৪১ )আছে সমাধানের জন্য। মাছ, মাংস, ভাত, রুটি কি নেই ওর কাছে। আর সব বাড়িতে বৌদির হাতে তৈরী। পরিমাণ এবং স্বাদে অতুলনীয়।  মাছের পিস দেখে আমার এক বন্ধুর মন্তব্য, এক পিস মাছে ত আমার বাড়ির সবার হয়ে যায়। মাংস, তিনজন খেয়ে তুলে রেখেছিলাম। পরেরদিন সকালে রাতের রুটি, মাংস খেয়েছি। দামঃ ১১০/- থেকে ১৩০/- টাকার মধ্যে।

ঘোড়াঘুড়িঃ জঙ্গলের মধ্যেই। বিশাল কিছু নয়, তবে সকালে, বিকেলে ঘুরে বেড়াতে বেশ ভালই লাগে। বাইরের দর্শনার্থীরদের ভীড় বেশ ভালই দেখলাম। এই বর্ষায়ও বেশ লোক এসেছিল। কাছাকাছি গ্রাম থেকেই বেশি।

প্রচুর হরিণ (সকালে খেতে দেবার সময় দেখতে পাওয়া যায়), ঘড়িয়াল (সরুমুখো কুমীর, মাছ খায়), আর খাঁচায় আবদ্ধ ময়ুর, অনেক রকম পাখী, একটা নীল গাই দেখেছি। যদিও লেখা আছে অনেক রকম সাপ আছে, একটা আমার সংগীরা দেখেছে, আমি শুধু ল্যাজটাই দেখতে পেয়েছি। অনেক পাখীর ডাক শুনেছি, কিন্তু কাক আর শালিক ছাড়া আর কোনটাকেই দেখতে পাইনি।


ফরেস্ট রেস্ট হাউস। দুটো ঘর। 

অশোকদা আর কল্যাণদা, যারা সঙ্গে থাকলে কোন চিন্তা নেই। 


জঙ্গলে ঢোকার রাস্তা।
ম্যাপ




ঘড়িয়াল



একটু বস, চলে যেও না...



আবদ্ধ ময়ুর



কিছুতেই মুখোমুখি হল না।


নীল গাই, বাংলাদেশ সীমান্তে চোরাচালানের সময় বাজেয়াপ্ত


প্রকৃতি বীক্ষন কেন্দ্র - খুব ভাল উদ্যোগ।


ফোন নম্বরের জন্য তোলা

মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে।




অভয়ারণ্যের গেটের বাইরে ঝুপস। সিগারেট, ডিম সেদ্ধর চাইতে বেশি কিছু আশা করলে আশাহত হবার সম্ভাবনা



বিকেলে জঙ্গল থেকে বেড়িয়ে NH 34 সাবধানে পার হয়ে সোজা রাস্তায় রেললাইন ধরে কিছুক্ষণ হেঁটে আসতেও মন্দ লাগবে না।

বৈকালিক আড্ডা



























সদা হাস্যমুখ শঙ্কর কীর্ত্তনীয়া

পরদিন সকালে হরিণের খাওয়া দেখে বেড়িয়ে পড়লাম কৃষ্ণনগর যাব বলে। জঙ্গলের সামনে থেকে বাস পাওয়া যায় বটে তবে জায়গা পাওয়া মুস্কিল আর সব বাস দাড়ায়ও না। তাই আমরা একটা বাসে উল্টোদিকে মানে বেথুয়া বাসস্ট্যান্ডে চলে গেলাম। ওখান থেকে বাসে বসে আবার জঙ্গলের ওপর দিয়ে ঘন্টা খানেকের মধ্যে কৃষ্ণনগর সদরে। কৃষ্ণনগরেরই এক বন্ধুর ঠিক করে দেওয়া টোটো এল। চালক নিমাই(দা) সরকার (৯৭৩৪৩৩১৯৬১), বয়স্ক মানুষ। অনেক কিছু জানেন। বলেনও অনেক কিছু। না শুনতে চাইলেও।

বাংলা ভাষার জন্য জীবন দিয়েছিলেন যারা, পূর্ব পাকিস্তান এবং আসামের বরাক উপতক্যায় - তাদের স্মরণে।

কবি ও নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, কৃষ্ণনগর সদর হাসপাতাল মোড়ে


প্রথমে গেলাম চার্চ। প্রতিষ্ঠা যদিও ১৮৭০'এ, কিন্তু ডাওসেস হিসেবে স্বীকৃতি পেতে পেতে ১৮৮৬। ঢুকতেই দরজাতে লেখা "অনুমতি ব্যতিরেকে ছবি তোলা নিষিদ্ধ"। ছোটবেলার স্বভাব (সত্যি বলছি  শরৎবাবুর "মেজদা" পড়ার আগেই), না ব্যপারটাতেই উৎসাহ বেশী। ভেতরে একজন ভদ্রমহিলা ঝাড়ু দিচ্ছিলেন, জিজ্ঞাসা করাতে মন্টুবাবুকে দেখিয়ে দিলেন। তাকে জিজ্ঞাসা করাতে প্রথমেই নাকচ করে দিলেন। তারপর অনুমতি ব্যতিরেকে মনে করিয়ে দিতে তিনি বললেন তাহলে ফাদারের কাছে যান। ফাদারকে কোথায় পাওয়া যাবে, সেটা অবশ্য বলে দিলেন। গেলাম। ফাদার যোসেফ সোরেন গোমস। ভারী সুন্দর একজন মানুষ। ব্লগের কথা বলাতে অনুমতি মিলল। শুধু অনুমতি না, যত খুশী, যেখানে খুশী ছবি তোলার। বাইরেই খৃষ্ট মন্দির। ভেতরে সুন্দর সাজানো। মন্দিরের উল্টোদিকে "রোড টু ক্যাল্ভারী" সুন্দর সাজানো। বেশ ভাল লাগল।







স্যাক্রামেন্ট অফ রিকনসিলিএসন



মূল চার্চ

ঘড়ি স্তম্ভ

খৃষ্ট মন্দির







খৃষ্ট মন্দিরের ভেতরে দেওয়ার চিত্র 



রোড টু ক্যাল্ভারী
যীশুখৃষ্টের ক্রস বহন 




ওখান থেকে এলাম বুড়িমা তলা। ঘিঞ্জি সরু রাস্তা। অথচ এখানেই নাকি সবচেয়ে বড় জগদ্ধাত্রী পুজা হয়। তখন অবশ্য এই রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয় গাড়ীঘোড়ার জন্য।

"১৭৭২ সালে রাজবাড়ির দেখাদেখি কৃষ্ণনগরের চাষাপাড়ায় রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের প্রজারা জগদ্ধাত্রী পূজা শুরু করেন। বুড়িমার পূজা নামে পরিচিত এই পূজা শুরু হয়েছিল ঘটে ও পটে। প্রথম দিকে স্থানীয় গোয়ালারা দুধ বিক্রি করে এই পূজার আয়োজন করতেন। ১৭৯০ সাল নাগাদ গোবিন্দ ঘোষ ঘটপটের পরিবর্তে প্রতিমায় জগদ্ধাত্রী পূজার সূচনা করেন। এখানকার প্রতিমার বৈশিষ্ট্য হল প্রায় সাড়ে সাতশো ভরি সোনায় গয়নায় দেবীপ্রতিমার অলংকারসজ্জা।" - উইকি


বুড়িমার মন্দির। জগদ্ধাত্রী ঠাকুরের।

বুড়িমার মন্দির। জগদ্ধাত্রী ঠাকুরের।
এখান থেকে ঘূর্ণি, কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুলের নামীদামি মৃৎশীল্পিদের স্টুডিও আর সেলস কাউন্টার এখানে। তাদের শিল্পকর্মগুলোও বেশ দামী। না কিনলেও ঘুরে দেখতে বেশ লাগে। খুব বেশী সময় এখানে দিতে পারিনি, কেননা আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি নামব নামব করছে।





কৃষ্ণনগর রাজবাড়ি এসে পড়লাম ঘূর্ণি ঘুরে।

এই চারমিনার সদৃশ প্রবেশ পথটি তৈরী করান রাজা রুদ্ররায়। 

মূল রাজবাড়ির প্রধান ফটক (দরজা)





রাজবাড়ির সামনে ফোপড়া হয়ে যাওয়া গাছ।


ভেতরে প্রবেশ নিষেধ, তাই আই হোল দিয়েই ছবি তুলতে হল। ওই ছোটবেলার অভ্যেস, "না" বললে সেটা করতেই হবে।

পেছনে রাজবাড়ি, যদিও রাজার উত্তরপুরুষেরা সবাই নাকি কলকাতায় থাকেন। 
রাজবাড়ীর সামনে এই মাঠেই বসে বারোদোলের মেলা। এপ্রিল মাসে কেউ বললেন ১৫ দিন, কেউ কেউ ৪১ দিন। এই মেলা চলে। বিভিন্ন জায়গা থেকে বিভিন্ন বিগ্রহ আসে, কাঠের দোলায়।


এই রে! আই কার্ড দেখতে চাইবে নাকি?

আকাশে ঘন কালো মেঘ, রাজ প্রাসাদের প্রবেশ তোরণ আর নিমাইদার টোটো। 

এমনিতেই সরু রাস্তার পাশে মন্দির, ভেতরে সামিয়ানা বেধে কোন একটা পুজো হচ্ছে। ছবি তোলার জন্য কোন সুযোগই রাখেনি। কেউ অবশ্য ছবি তুলতে নাও বলেনি, বললে হয়ত সামিয়ানা ছিড়েই ছবি তোলার তোড়জোড় করতাম।

"১৮০৬ খ্রিষ্টাব্দে মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের পুত্র গিরীশচন্দ্র আনন্দময়ী কালীর একরত্ন মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। ভিতের সঙ্গে সংযোগ না রেখে টুঙ্গী বসিয়ে এই মন্দির নির্মাণ করা হয়েছে। মন্দিরের চূড়া খাজযুক্ত ও ছত্রাকৃতির এবং দেওয়ালে মূর্তি খোদিত। গর্ভগৃহে পঞ্চমুণ্ডির আসনের ওপর পাথরের বেদীতে শায়িত শিব বিগ্রহ। তাঁর ওপরে ধ্যানাসনে উপবিষ্টা কশটিপাথরে নির্মিত তিন ফুট উচ্চ চতুর্ভূজা দেবীবিগ্রহ।"- ঊইকি







এবার সবচেয়ে কষ্টকর অধ্যায়- ফিরে আসা। কোথাও গেলে ফেরার দিন সকাল থেকেই আমার কিছু ভাল লাগে না। ভীষণ মন খারাপ হয়ে যায়। তাও, ফিরতে ত হয়ই।

বাড়ি ফিরলামঃ ১১.৭.২০১৬

নিমাইদার সঙ্গে চুক্তিই ছিল, দুটো নাগাদ আমাদের নিয়ে কৃষ্ণনগর স্টেশনে পৌছে দেবেন। টিকিট কেটে (২৫/- জন প্রতি) তিনটে কুড়ির কৃষ্ণনগর লোকাল ধরলাম। আড়াই ঘন্টা মত লাগে বিধাননগর আসতে। অনেক স্মৃতি আর ভীষণ মন খারাপ নিয়ে ছটার মধ্যে বাড়ি। 


আরো কিছু জানতে হলে, মন্তব্যের ঘরে জানতে চাইতে পারেন। যতটা জেনেছি, তার যতটা মনে থাকবে, ভাগ করে নেব।